Foto

Please Share If You Like This News

Buffer Digg Facebook Google LinkedIn Pinterest Print Reddit StumbleUpon Tumblr Twitter VK Yummly

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছবি থাকলেও বইটির কোথাও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নেই। শুধু তা-ই নয়, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের কথা বলা হলেও ভাষণ প্রদানের স্থান (রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) উল্লেখ করা হয়নি।


আদালতের নির্দেশে গঠিত সরকারের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বইয়ে উল্লেখ থাকলেও স্বাধীনতা ঘোষণার তারিখ ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণার বিষয়ে বইয়ে উল্লেখ নেই। বইটিতে স্বাধীনতার ইতিহাস বর্ণিত হলেও তা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।

সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদনটি কমিটির পক্ষ থেকে দাখিল করা হয় অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদারের কাছে। এরপর প্রতিবেদনটি উচ্চ আদালতে পাঠানোর জন্য অনুমোদন চাওয়া হলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তা অনুমোদন দেন।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে উল্লিখিত সব তথ্য। এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রধান অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. জাফর উদ্দীন রোববার যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত রিপোর্ট অর্থ সচিবের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। এটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উচ্চ আদালতে পাঠানো হবে। তবে প্রতিবেদনে কী আছে, সে ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

জান গেছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন বর্তমান গভর্নর ফজলে কবির। এর আগে পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করার পর ২০১৭ সালে ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ নামের গ্রন্থটি। কিন্তু এ বইয়ে বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করার অভিযোগ ওঠে। এরপর বইটি বিতরণ বন্ধের নির্দেশ দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এরপর জনস্বার্থে ড. কাজী এরতেজা হাসানের উচ্চ আদালতে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২ অক্টোবর ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ গ্রন্থে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করতে অর্থ সচিবকে নির্দেশ দেন আদালত। কমিটিকে এক মাসের মধ্যে উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন দাখিলেরও নির্দেশ দেয়া হয়। বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ গ্রন্থে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অন্তর্ভুক্ত না করে ইতিহাস বিকৃতি করা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে। অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, নির্বাহী ব্যবস্থাপক এবং প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের আবুল কালাম আজাদকে রুলের জবাব চার সপ্তাহের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে।

সূত্রমতে, আদালতের নির্দেশের পর ১৬ অক্টোবর অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জাফর উদ্দীনকে (বাজেট ও সামষ্টিক অর্থনীতি) প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবিএম রুহুল আজাদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (সীমান্ত) মুহাম্মদ মুহসিন চৌধুরী ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব স্মৃতি কর্মকার।

সূত্র আরও জানায়, সরকারের গঠিত কমিটিকে চারটি বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। এগুলো হচ্ছ- ১. বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস বইয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি না ছাপানো, ২. পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানের ছবি ছাপিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে কি না, ৩. ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কথা’ শিরোনামে গ্রন্থটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ইশতেহার যথাযথ সন্নিবেশিত না করে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে কি না, ৪. ইতিহাস বিকৃতি হয়ে থাকলে এর সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করা।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিটির সদস্যরা চার দফা বাংলাদেশ ব্যাংকে উপস্থিত হয়ে বইটির প্রকাশনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা, সম্পাদনা ও গবেষণা এবং পাণ্ডুলিপি কমিটির সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। তাদের লিখিত বক্তব্যও গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কমিটি সদস্য ও কর্মকর্তা-ব্যক্তিদের বক্তব্য ও রের্কড পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তদন্ত কমিটি মনে করে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের নামকরণ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় পিও নং-১২৭/৭২ সালে। এ কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস বইটিতে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট বঙ্গবন্ধুর ছবি খুঁজে পাওয়া যায়নি- এ যুক্তিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। গ্রন্থটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অন্তর্ভুক্ত না করায় ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে মর্মে কমিটি মনে করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত গ্রন্থটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও বিকৃতি করা হয়েছে। পাশাপাশি এ গ্রন্থটি প্রণয়নের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, তথ্য-উপাত্ত ও সংযোজিত ছবি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সম্পাদন কমিটির কাজের মধ্যে ছিল অনেক অসঙ্গতি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গ্রন্থটিতে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছবি সংযোজন না করা শ্রেয় ছিল এবং এটি সংশ্লিষ্ট সবার ভুল ছিল বলে বইটির সম্পাদক শুভঙ্কর সাহা স্বীকার করেছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ড. সনৎ কুমার সাহা পাণ্ডুলিপি বিষয়ে যে মতামত দিয়েছেন, সেটি অনুসরণ করলে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছবি বইয়ে সংযোজন করার মতো অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত ঘটনার সৃষ্টি হতো না। কাজেই তাদের ছবি না ছাপানোই শ্রেয় ছিল।

জানা গেছে, ড. আতিউর রহমান গভর্নর থাকা অবস্থায় গ্রন্থটি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ২০১৬ সালের মার্চে তার পদত্যাগের পর প্রকাশিত হয়েছে গ্রন্থটি। গ্রন্থ প্রকাশের আগে কয়েক দফা সম্পাদক পরিবর্তনের পর সর্বশেষ সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা। তার আগে সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন আরেক নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র ম. মাহফুজুর রহমান।

৩৬১ পৃষ্ঠার বইটি দুই পর্বে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্ব ১ থেকে ৩৪২ পৃষ্ঠাজুড়ে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, স্মৃতিচারণ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ইতিহাস রয়েছে। আর ৩৪৩ থেকে ৩৬১ পৃষ্ঠায় রয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি। এর মধ্যে ছবি পর্বে প্রথম পৃষ্ঠায় রয়েছে আইয়ুব খানের দুটি ছবি। আর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের একটি গ্রুপ ছবি। ৩৪৩ পৃষ্ঠায় আইয়ুব খানের প্রথম ছবির নিচে ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে- স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের, ঢাকার মতিঝিলস্থ প্রধান ভবনের পরিদর্শন বহিতে স্বাক্ষর করছেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আইয়ুব খান (১০ ডিসেম্বর ১৯৬৮)। একই পৃষ্ঠায় দ্বিতীয় ছবির ক্যাপশনে রয়েছে- পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আইয়ুব খান ও স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান, ঢাকার প্রধান ভবনের কর্মকর্তারা (সন ১৯৬৮)। বইয়ের প্রথম পর্বের ৮২ পৃষ্ঠায় রয়েছে আইয়ুব খানের অন্য একটি ছবি। ছবির নিচে ক্যাপশনে লেখা আছে- পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আইয়ুব খান ১০ ডিসেম্বর ১৯৬৮ তারিখে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান, ঢাকার নতুন ভবন উদ্বোধন করেন। পরের পৃষ্ঠায় ছবি রয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানের।

বইয়ের ৮৪ পৃষ্ঠায় শেখ হাসিনা প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ৩০ তলা ভবনের উদ্বোধনের একটি ছবি ছাপা হলেও তা অস্পষ্ট। বইটির প্রকাশনা প্রকল্পের উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ড. সনৎকুমার সাহা, উপদেষ্টা আল্লাহ মালিক কাজেমী এবং সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. আবুল কাশেম. আবু হেনা মোহা. রাজি হাসান ও এসকে সুর চৌধুরীর নাম উল্লেখ রয়েছে। সম্পাদকমণ্ডলী হিসেবে নাম রয়েছে শুভঙ্কর সাহা, ম. মাহাফুজুর রহমান, ড. আবুল কালাম আজাদ, নাসিরুজ্জামান, এফএম মোকাম্মেল হক, গোপাল চন্দ্র দাস, আনোয়ারুল ইসলাম, নাজিম উদ্দিন, জোবায়দা আফরোজ ও ইন্দ্রানী হকের।

bottom