Foto

Please Share If You Like This News

Buffer Digg Facebook Google LinkedIn Pinterest Print Reddit StumbleUpon Tumblr Twitter VK Yummly

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক দিন৷ বজবজ থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে গঙ্গার ঘাটে নোঙর করল এক বিশাল বাণিজ্যতরী৷ সে দিন সেই আগন্তুক বাণিজ্যতরীটি দেখে তৎকালীন জমিদারমশাই তৎক্ষণাৎ তরীটি আটক করার নির্দেশ দিলেন৷ বাণিজ্যতরী থেকে নেমে এলেন ছোটো ছোটো চোখবিশিষ্ট এক ব্যক্তি। জমিদারের নায়েব তাঁর কাছে জানতে, তাঁদের জমিদারিতে এ ভাবে পা রাখার উদ্দেশ্য কী।


প্রত্যুত্তরে মানুষটির কাছ থেকে জবাব এল, “আমি মি: টং আছিও, তোমাদের জন্য চা নিয়ে এসেছি।” জমিদারবাহিনী তো শুনে থ। এই ‘চা’ আবার কী বস্তু৷ তখন টং আছিও সেই মুহূর্তে জাহাজের কর্মীদের সাহায্যে সবাইকে চা বানিয়ে খাওয়ালেন৷ খেয়ে সবাই বুঝলেন কী অদ্ভুত পানীয়! খাওয়ামাত্র শরীর চাঙ্গা।
এমন অদ্ভুত বস্তুর মাধ্যমে টং আছিও সবার মন জিতে নিলেন আর ভারতের মাটিতে আরম্ভ হল চা-পানের অধ্যায়৷শুধু সে দিন ভারতীয় জমিদাররাই নন, তৎকালীন গভর্ণর লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের মুখেও এই চা নামক বস্তুটির স্বাদ পৌঁছে গেল৷ টং আছিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল হেস্টিংস সাহেবের। আছিও সাহেব ভারতের মাটিতে চিনিকল বসানোর বাসনা ব্যক্ত করলেন তাঁর কাছে৷ আছিও সাহেবকে চিনিকল তৈরি করার জন্য বজবজের কাছে গঙ্গার ধারে বার্ষিক ৪৫ টাকার বিনিময়ে ৬৫০ একর জমি প্রদান করা হল৷ এর পর টং আছিও আবার দেশে ফিরে কয়েকশো চিনা কর্মচারী-সহ চা তৈরির মেসিন নিয়ে আসেন এবং গঙ্গার ধারের সেই জমিতে চিনিকল বসিয়ে চিনি উৎপাদন শুরু করেন৷ এ ভাবে শুরু হয়েছিল ভারতে প্রথম চিনি উৎপাদন। এর আগে ভারতীয়রা চিনি সম্পর্কে অবগত ছিল না৷ এ ছাড়া আছিও সাহেব ভারতীয় চাষিদের দিয়ে নীলচাষও করাতেন৷
যখন এই সব ঘটনা ঘটছে তখন কলকাতার শহরে গাড়ি বলতে ছিল ইংরেজ সাহেব আর বিত্তবান বাবুদের ব্যবহার করার জন্য জুড়িগাড়ি, যাতে চড়া ছিল সাধারণ মানুষের স্বপ্নাতীত৷ টং আছিও সাধারণ মনুষের যাতায়াত অতি স্বল্প খরচে সুগম করতে আর্ কিছু মানুষের রুচিরোজগারের ব্যবস্থা করতে কলকাতার রাস্তায় প্রথম টানা-রিকশার প্রবর্তন করেন৷ আছিও সাহেবের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল কলকাতার রাস্তায় টানা-রিকশার পথচলা ৷

টং আছিও ভারতে দ্বিতীয় বারের জন্য এসে আর ফিরে যাননি৷ আছিও সাহেব সারা জীবন অবিবাহিত ছিলেন৷ তাঁর দেখাশোনা করতেন টেলিবিবি নামে এক মুসলিম মহিলা৷ শেষ জীবনেও তিনি আছিও সাহেবের সেবা করে গিয়েছেন৷ মৃত্যুর পর আছিও সাহেবকে গঙ্গার পারে তাঁর চিনিকলের কাছে সমাধিস্থ করা৷ কয়েক বছর বাদে টেলিবিবিও দেহ রাখেন৷ আছিও সাহেবের সঙ্গে দেশ থেকে এসে তাঁর কর্মচারী ও সঙ্গীরাও ভারতের মাটিতে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন৷ তবে চিনা সাহেবের মৃত্যুর পর চিনিকল বন্ধ হয়ে যায়। কলের সব কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা রুচি রোজগরের টানে বজবজের ধারের সেই জায়গা ছেড়ে কলকাতার কিছু জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন৷ এর মধ্যে নাম করতে হয় অধুনা ট্যাংরা অঞ্চলের চিনাপাড়া৷ এখানে চিনা সম্প্রদায়ের মূল রুজি রেস্তোরাঁ ব্যবসা৷
চিনা সাহেব টং আছিওর পদার্পণের সূত্রে বজবজের কাছে গঙ্গার ধারের সেই জায়গা আজ অছিপুর নামে পরিচিত। সেই অছিপুরেই পা রাখলাম একদিন। প্রথমেই গেলাম চিনেম্যানতলায়। যে জায়গায় আছিও ও তাঁর সঙ্গীরা ভারতের মাটিতে প্রথম পা রাখেন বর্তমানে সেই স্থানটিই চিনেম্যানতলা নামে পরিচিত৷ কেউ কেউ আবার স্থানটিকে চিনেকুঠিতলা বলেও ডেকে থাকেন৷ নামে ‘চিনে’ থাকলেও বর্তমানে এখানে কোনো চিনার বাস নেই। তবে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১২ থেকে ২৪ তারিখ চিনা নববর্ষ উপলক্ষ্যে এখানে জাঁকালো উৎসব হয়। সেই সময়ে দেশের নানা প্রান্ত, এমনকি বিদেশ থেকেও চিনারা এখানে আসেন৷ চিনেম্যানতলার প্রধান দ্রষ্টব্য ‘পাকুমপাহ’র মন্দির। সেই মন্দিরের বিগ্রহ দু’টিকে স্থানীয় মানুষ খোদা-খুদি নামে ডাকেন৷ এই মন্দিরটি আছিও সাহেব নির্মাণ করান৷

আছিও সাহেবের সময় এই জায়গা সুন্দরবন অঞ্চলের মধ্যেই ছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এখানে প্রচুর বাঘের উপদ্রব ছিল৷ বাঘদেবতাকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে আছিও সাহেব দক্ষিণ রায়ের মন্দির স্থাপন করেন৷ মন্দিরটি আকারে ছোটো চতুষ্কোণ-বিশিষ্ট। ভেতর কোনো মূর্তি নেই। ঘটকেই দেবতা মনে করে পুজো করা হয়৷ পরবর্তী কালে আছিও সাহেব দক্ষিণ রায়ের মন্দিরের সম্মুখ ভাগে চৈনিক দেবদেবী ‘পাকুমপাহ’ (খোদাখুদি)-র মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন৷ স্থানীয় মানুষজন বলেন, আগে এই দেবদেবীর মূর্তি সোনার ছিল। মৃত্যুর আগে আছিও সাহেব এক স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নাদেশ পেয়ে সোনার মূর্তি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে চন্দন কাঠের মূর্তি মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন৷ মন্দিরের গর্ভগৃহ আয়তনে ছোটো হলেও খুব যত্নে সাজানো৷ মূল মন্দিরের সামনে প্রার্থনাকক্ষ। সেখানে লম্বা একটি টেবিলে সারি সারি মোমবাতি ও ধুপকাঠি জ্বালানোর ব্যাবস্থা, যেগুলি ফেব্রুয়ারি মাসে চিনা নববর্ষের সময় সুশোভিত হয়ে ওঠে৷ মন্দিরের ডান দিকে বিশ্রামকক্ষ। সেখানে এক পাশের দেওয়ালে মন্দির সংস্কারে সাহায্যদাতাদের চিনা হরফে শ্বেতপাথরের ওপর লেখা৷ মন্দিরের বাঁ দিকের কোণে চিনাদের আরেক দেবতা কনফুসিয়াসের মন্দিরকক্ষ৷ এই কক্ষের সামনে আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে আছিও সাহেবের বাণিজ্যতরীর একটি অংশ৷ পুরো মন্দিরচত্বর পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ মূল দরজাটি বেশ সুন্দর৷ সামনে বড়ো মাঠের মতো ফাঁকা জায়গা। মাঠের পাঁচিলের আরেক পাশে ছিল আছিও সাহেবের চিনির কল, যা আজ সম্পূর্ণ অবলুপ্ত৷ সেই জায়গায় গড়ে উঠেছে ঘনবসতি৷ আর মন্দিরের পেছনে যে পুকুরপাড়, সেখানেই ছিল আছিও সাহেবের নীলচাষের খেত৷ পুরো মন্দিরচত্বর গাছগাছালিতে ছাওয়া, সুন্দর পরিবেশ৷ স্নিগ্ধতা, শান্তি এখানে পরম প্রাপ্তি৷
মন্দিরের মুল গেট দিয়ে বেরিয়ে ডান হাতে কিছুটা পথ গিয়ে গঙ্গা৷ গঙ্গা এখানে বেশ চওড়া, অপর পারে উলুবেড়িয়া৷ এই গঙ্গার পাড় ধরে বাঁ দিকে কিছুটা গেলে রয়েছে আছিও সাহেবের সমাধি৷ সমাধিস্থলটি নির্জন। জোয়ারের সময়ে গঙ্গার জলের ছলাৎ ছলাত শব্দে মনটা ভরে ওঠে৷ জীবনের সমস্ত কষ্ট-বেদনা, না-পাওয়া, সব মিটিয়ে এক অনাবিল আনন্দে যেন পরিপূর্ণ পরিপুর্ন করে দেয় এই স্থান৷ সমাধিবেদিটি সুন্দর করে বাঁধানো, লাল রঙের। এখানে গঙ্গার সেই সুন্দর ধ্বনি শুনতে শুনতে চিরনিদ্রায় রয়েছেন আছিও সাহেব৷

আছিও সাহেবের সমাধি ছেড়ে দক্ষিণমুখী আরও পনেরো মিনিট হাঁটার পর বাঁ হাতে পড়ল নবাবি আমলে নির্মিত এবং বর্তমান আমলে ধ্বংসপ্রাপ্ত বারুদকল৷ না, না পারলে হাঁটবেন না। অছিপুর বেড়াতে এসে রিকশা চেপে ঘুরে যাবেন এই বারুদকলটি৷ তবে গঙ্গার পাড় বরাবর বেশ কিছুটা সময় ধরে হেঁটে মনকে তৃপ্ত করে নেওয়া যায়৷ এই হল আজকের অছিপুর৷

ফেরার পথে চড়িয়াল মোড় থেকে অটো বা ম্যজিক গাড়িতে করে বাওয়ালি ট্রেকার স্ট্যান্ডে নেমে বাঁ হাতি পথে মিনিট পাঁচেক পথ হেঁটে ঘুরে নিতে পারেন বাওয়ালি রাজবাড়ি৷
কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে বজবজ লোকালে বজবজ স্টেশন। সেখান থেকে অছিপুরের অটোতে বড়োবটতলা নেমে বাঁহাতি রাস্তায় হেঁটে ১০ মিনিট বা রিকশায় ৫ মিনিটে পৌঁছে যান চিনেম্যানতলা৷ আর ধর্মতলা থেকে ৭৭ নং বাসে চড়ে সরাসরি পৌঁছে জেট পারেন অছিপুর বড়োবটতলা৷

bottom