Foto

Please Share If You Like This News

Buffer Digg Facebook Google LinkedIn Pinterest Print Reddit StumbleUpon Tumblr Twitter VK Yummly

দীর্ঘ পাঁচ বছরের সংঘবদ্ধ মিথ্যাচারের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিএনপি স্বীকার করল তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক আশ্রয়ে লন্ডনে অবস্থান করছে। ২০১২ সালে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের প্রার্থনা করার পর ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট ত্যাগ করে তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করে।


এই সত্য স্বীকার করে বিএনপি নিজেদের বিগত ৫ বছরের সকল অফিশিয়াল বক্তব্যকে নিজেরাই মিথ্যে ঘোষণা করলো। বাংলাদেশের অন্যতম দাপুটে বিরোধী দল হিসেবে দাবি করা বিএনপি বিগত ৫ বছর ধরে বলে এসেছে, তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক পাসপোর্ট ত্যাগ করার বিষয়টি সামনে এলেও বিএনপি তাদের মিথ্যের অবস্থানেই দাড়িয়ে থেকেছে। সোমবারও তারেক রহমানের আইনজীবী কায়সার কামাল বিবিসিকে একই কথা জানিয়েছে। সোমবার পর্যন্ত মীর্যা ফখরুল, রুহুল কবীর রিজভী ও কায়সার কামাল পাসপোর্ট সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিলেও, প্রত্যেকের ভাষ্যে যে-বিষয়ে অভিন্নতা  ছিলো তাহলো পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম মিথ্যাচার করেছে। এর প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করে পাসপোর্ট দেখানোর দাবি জানিয়েছিলেন রিজভী। অন্যদিকে বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল আরো একধাপ এগিয়ে তারেক রহমানের পক্ষ হয়ে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং দুইটি পত্রিকার কাছে।

বিএনপির এই অবস্থানে সাধারণ মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে সরকার তারেক রহমান সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, ঠিক তখন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তারেক রহমানের পাসপোর্ট প্রকাশ করলেন সাংবাদিকদের সামনে। বিএনপির আগের  বেশ কটি ইস্যুর পরিণতির মত এবারও দেশের জনগণ তাদের দ্বারা প্রতারিত অনুভব করলো। বিষয়টি শুরুতেই মেনে নিলে ক্ষতিটা যতটুকু হতো, জনগণকে পুনরায় প্রতারিত করে ক্ষতি অনেক গুণ বেশি হলো। জনসমর্থন বিবেচনায় লাভ কার বেশি হলো? সরকারের নাকি বিএনপির?

এখন মীর্যা ফখরুল দীর্ঘ পাঁচ বছর তারেক রহমানের রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার বিষয়টি জাতির সামনে বিস্তারিত জানাতে বাধ্য হচ্ছেন। বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত সংবাদে তিনি বলেন, ২০১২ সালে তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই সেটি গৃহীত হয়েছিলো। অর্থাৎ ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন না তারেক রহমান এবং চিকিৎসার উদ্দেশ্যেও তিনি লন্ডনে নেই। প্রশ্ন হল- বিষয়টি বিএনপির নেতৃবৃন্দের কাছে কি বিগত ৫ বছর অজানা ছিলো? নাকি ইচ্ছে করে তারা তথ্যটি গোপন করেছে? আর গোপন করার কারণ কী?

এর উত্তর পাওয়া গেছে মীর্যা ফখরুলের বক্তব্যে। তিনি বিবিসিকে বলেন, আমরা সবাই জানি যে তারেক রহমান সাহেব বিদেশে চিকিৎসার জন্য গেছেন। তারপর এখানে দেশে বর্তমান সরকার তার বিরুদ্ধে যেভাবে মামলা-মোকদ্দমা এবং বিনা বিচারে সাজা দিচ্ছে সে কারণে তিনি অ্যাসাইলাম (রাজনৈতিক আশ্রয়) চেয়েছেন।

অর্থাৎ এটি স্পষ্ট তারেক রহমান মামলার সাজার হাত থেকে রক্ষা পেতেই রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলাটির বিচার শুরু হয় ২০১১ সালের ৬ জুলাই। ক্রমশ তথ্য প্রমাণগুলো সামনে আসতে থাকায় মামলায় সাজার সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। সাজা হবার ভয়েই তিনি ২০১২ সালে  রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। বিচার শেষে নিম্ন আদালতে মানি লন্ডারিং মামলার রায় হয় ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর। ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের খালাসের বিরুদ্ধে আপিলের আবেদন করে দুদক। এই বছর ব্রিটেনে সরকারের কাছে পাসপোর্ট জমা দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন তারেক রহমান।

২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট দুদকের আপিল গ্রহণ করে তারেককে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। কিন্তু তারেক আত্মসমর্পণ না করলে তার বিরুদ্ধে সমন জারি করে লন্ডনের ঠিকানায় পাঠানো হয়। তারও কোন উত্তর পাওয়া না গেলে দুদকের করা আপিলের সঙ্গে কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে মামুনের করা আপিল একই সঙ্গে শুনানি শুরু হয়। ২০১৬ সালের ৪ মে হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়, শেষ হয় ১৬ জুন এবং রায় প্রদান করা হয় একই বছরের ২১ জুলাই। বিচার পর্যালোচনায় উচ্চ আদালত জানায়, তারেক রহমান সচেতনভাবে এই আর্থিক অপরাধের অংশ ছিলেন। তাই তিনি কোনো ধরনের ছাড় পেতে পারেন না।

শুধু এই একটি মামলা নয়, দুর্ভাগ্যক্রমে মা বেগম জিয়ার অধিকাংশ মামলার আসামি তারেক রহমান। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এর আগে মানি লন্ডারিং মামলায় তাকে অপর এক মামলায় ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এই হিসেবে খালেদা জিয়ার ৫ বছরের কারাদণ্ডের প্রেক্ষিতে বর্তমানে ১৭ বছরের কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামি তারেক রহমান। সেই সঙ্গে তাকে জরিমানা করা হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা।

এ ছাড়াও আরো বেশ কিছু মামলা এখনো চলমান রয়েছে তারেক রহমানের নামে। কিছু মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে ও তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা যেখানে নিহত হন ২৪ জন। তার বিরুদ্ধে চলমান আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলা হলো- সোনালী ব্যাংক বনাম ড্যান্ডি ডাইং ঋণ খেলাপি মামলা ও অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে দুর্নীতি মামলা। বর্তমানে চারটি মামলায় পলাতক আসামি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত প্রধান। এই মামলাগুলোর বর্তমান কার্যক্রম ও শুনানি অনুসারে দোষী সাব্যস্ত হলে তারেক রহমানের সাজার পরিমাণ হবে তার মায়ের থেকে প্রায় ৬ গুণ বেশি। যেখানে বেগম খালেদা জিয়া মাত্র ৫ বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত নতুন চেয়ারপার্সন তৈরি করতে হল বিএনপির, সেখানে তাদের নতুন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ১৭ বছরের কারাদণ্ড রয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিতভাবে এই দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের ভেবে দেখা দরকার। সাজাপ্রাপ্ত একজনের কাছ থেকে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব তার থেকেও বেশি সাজাপ্রাপ্ত অপর একজনকে দেয়া কতটা যৌক্তিক। তাও এমন একজনের কাছে দায়িত্ব দেয়া যে পলাতক আসামি এবং নিজ দেশের আদালত থেকে তার বক্তব্য প্রচারের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অর্থাৎ নিজ দল ও জাতির উদ্দেশ্যে দলীয় প্রধান কোন কথাই বলতে পারবেন না! তাহলে সেই দলের ভবিষ্যৎ কী?

তারেক রহমান বর্তমানে অবস্থান করছেন লন্ডনে। সেখানেই বিএনপির কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না তিনি। লন্ডনে বিএনপি সম্মেলন করতে গিয়ে মারামারি করে লন্ডন পুলিশের নজরে এসেছে। চলতি বছরে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা করেছে বিএনপির লন্ডনে থাকা নেতৃবৃন্দ। এর মাধ্যমে দলটি গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে বিদেশে এবং দেশে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান লন্ডনে বসে করা বাংলাদেশের জন্য কতটা অসম্মানজনক তা জাতীয় পর্যায়ের একটি দল হিসেবে বিএনপির কি অজানা?

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে ৭ বছরের সাজা পাওয়া পলাতক একজন আসামি তারেক রহমান। পলাতক এই আসামির জাতির উদ্দেশ্যে কিছু বলার ক্ষেত্র রয়েছে আদালতের নিষেধাজ্ঞা। তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই। নির্বাচনে একজন ভোটার হিসেবে ভোট দেয়ার জন্য নেই বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র। রাজনৈতিক আশ্রয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন তিনি। নিজের স্ত্রী ও মেয়ের জন্যও রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন লন্ডনে। এমন ব্যক্তিকে একটি দল তাদের শীর্ষ নেতা হিসেবে কিভাবে নির্বাচন করতে পারে? আর এমন একজন নেতার কাছ থেকে তার দল ভবিষ্যতে কিবা আশা করতে পারে! জনগণের প্রত্যাশার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।

bottom