Foto

Please Share If You Like This News


Buffer Digg Facebook Google LinkedIn Pinterest Print Reddit StumbleUpon Tumblr Twitter VK Yummly

রাজধানীর হাতিরঝিল। পড়ন্ত বিকেল। চোখ আটকে গেল কৃষ্ণচূড়াগাছের ছায়ায় ঘুমন্ত শিশুটির দিকে। কয়েকটা মাছি তার ঠোঁটে-নাকে-মুখে বারবার বসে উৎপাত করছে। ঘুমের মধ্যেই শিশুটি হাত-পা নাড়াচাড়া করে মাছি তাড়ানোর চেষ্টা করছে। আশপাশে আরও কয়েকটি শিশু দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত। তাদের একজন জাকির ইমন (১২)। জানতে চাইলে জাকির জানাল ঘুমন্ত শিশুটির নাম—‘ওর নাম রাজু। বাপ-মা নাই, টোকাই পোলা।


Hostens.com - A home for your website

কিন্তু ওরে আমরা খুব আদর করি। পোলাটা বালো (ভালো), কারও লগে ঝগড়া করে না। ও এহন আমগো বন্ধু হয়ে গ্যাছে। ওর আরেকটা নাম আছে—বুলেট। আমরাই নামটা দিছি।
জাকিরের সঙ্গে কথার ফাঁকে এগিয়ে আসে সোহেল (১২)। বলে, পাঁচটা ট্যাকা দেন, না হইলে চাইর ট্যাকা দেন মিল হইয়া যাইব। মিল হওয়ার বিষয়টি কী—হাফপ্যান্টের কোঁচ থেকে টাকার মোড়া বের করে গুনতে লাগল সোহেল। টাকা গুনে বলে, আর চাইর ট্যাকা হইলে ১৩০ ট্যাকা মিল হইব। এ টাকা কোথায় পেলে? কাজ করে ও মানুষের কাছে চেয়ে এই টাকা সে জোগাড় করেছে, বলল সোহেল। এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে চার টাকা নিয়ে ১৩০ টাকা মিল করেই ছাড়ল সে। পরে সটকে পড়ল। তার আগে জানাল, স্কুলের নিয়মকানুনে সে অতিষ্ঠ। তাই জীবন থেকে স্কুলকে ছুটি দিয়েছে। তার মা গৃহিণী, বাবা মাইক্রোবাস চালান। মগবাজার আমবাগান এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকে তারা।
এদিকে জাকির, হীরা ও লাবুর সঙ্গে কথা চলছিল। জাকির মাসে ২ হাজার টাকা মজুরিতে পানি সাপ্লাইয়ের কাজ করে। বড় ভাই চাকরি করে, বাবা দিনমজুর ও মা গৃহিণী। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে সে। হীরা ফেরি করে চা বিক্রি করে হাতিরঝিলে, তার মা বিক্রি করে পান। হীরা ও জাকিরের চেয়ে বয়স-গড়নে ছোট লাবু। স্কুলে যাওয়ার খবর নেই, দুষ্টুমিতে এগিয়ে। ওরা জানাল, রাজুর বাবা বিদেশ গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। আর ওর মা আরেকজনকে বিয়ে করেছেন।
জাকির, হীরা ও লাবুর কথার সত্যতা যাচাই করা দরকার। তাই রাজুর ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় প্রায় দুই ঘণ্টা কেটে গেল। ততক্ষণে পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবল। কিন্তু ঘুম ভাঙল না রাজুর। তাকে বিরক্ত না করে এই প্রতিবেদক কারওয়ান বাজারে নিজের গন্তব্যে চলে গেলেন। তবে রাত নয়টার দিকে ফেরার পথে সেই রাজুর দেখা মিলল কৃষ্ণচূড়াগাছটির নিচেই। বসে আছে রাজু, কিন্তু ঘুমের ঘোর যেন কাটেনি। চেহারায় অযত্ন-অবহেলার ছাপ। দুটি মার্বেল হাতে খেলছিল। বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে রাজু বলতে পারেনি। তবে মায়ের নাম বলল, গেদুনি। বাবা বিদেশ গিয়ে মারা যাওয়ার কথা ঠিক। তবে মা অন্যজনকে বিয়ে করে নিরুদ্দেশ হওয়ার বিষয়টি তাকে প্রায় অস্বস্তির মধ্যে ফেলে। তাই এক কথায় উত্তর, ছোটবেলায় মা-ও মারা গেছে।
রাজু বলল, তারা দুই ভাইবোন। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে ভাইবোন সিলেটের গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকা চলে আসে। প্রথমে মালিবাগে বড় বোন ও তাঁর রিকশাচালক স্বামীর সঙ্গে ভাড়া বাসায় থেকেছে সে। বোনের শাসন-বারণ তার ভালো লাগেনি। এ জন্য বেশ কয়েকবার বোনের বাসা থেকে বের হয়ে চলে গেছে, আবার ফিরেও এসেছে। কিন্তু কয়েক মাস আগে বোনের সঙ্গে অভিমান করে সে আর ফেরেনি।

তারপর থেকে ১২–১৩ বছরের কিশোর রাজু বউবাজারসংলগ্ন হাতিরঝিল এলাকায় এসে ঠাঁই নিয়েছে। এখানে তার অবারিত স্বাধীনতা। মন চাইলে চটপটির দোকান থেকে পানির বোতল নিয়ে ফেরি করে বিক্রি করে যা টাকা পায়, তা দিয়ে খাবার কিনে খায়। মন না চাইলে কৃষ্ণচূড়ার নিচে শুয়ে, বসে, ঘুমিয়ে কিংবা আড্ডায় কাটিয়ে দেয়। স্কুল, পড়ালেখা কিংবা টাকার জন্য কোনো দোকানে নিয়মিত কাজ করা একদম সহ্য করতে পারে না সে। কেউ যদি তোমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয় যাবে? এ প্রশ্নে চরম বিরক্ত রাজুর জবাব, আমার কোনো জায়গায় যাওনের দরকার নাই, পড়াশোনা ভাল্লাগে না। আমি এই হানে ভালো আছি।
যে বয়সে স্কুলের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মেশার আগ্রহ থাকার কথা, হইহুল্লোড় করে সময় পার করার কথা, সে বয়সে রাজু নিষ্প্রাণ-নিস্তেজ। কোনো কিছুতেই তার আগ্রহ নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও মনোরোগ চিকিৎসক আহমেদ হেলাল প্রথম আলোকে বলেন, আসলে ছেলেটির অনিয়ন্ত্রিত জীবনের কারণে পড়ালেখায় আর আগ্রহ পাচ্ছে না। সংগঠিত পরিবারে না থাকায় এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে পরিবারের নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই। ফলে অবারিত স্বাধীনতা পেয়ে সাময়িক আনন্দ পাচ্ছে, এটাকে লাভ মনে করছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের জীবন তার জন্য ক্ষতিকর।

পেটের টান পড়লেই কেবল পানির বোতল বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে খাবার কিনে খায় রাজু। সে বলে, আমি অন্যদের মতো ভিক্ষা করি না। পাইলে খাই, না হইলে নাই। হাতিরঝিলের এক ভ্রাম্যমাণ দোকানি বললেন, কয়েক মাস ধরে রাজুকে এখানে দেখা যাচ্ছে। দোকানের কাজ দিতে চাই, কিন্তু ও করতে চায় না। আলসেমি করে ঘুমায় আর আড্ডা দেয়। তাই খাওনদাওনও ঠিকমতো পায় না। হাতিরঝিলে যেকোনো সময় সুবিধাবঞ্চিত বা পথশিশুর দেখা মেলে। অনেক শিশুকে পথচারীদের কাছে টাকা চাইতে দেখা যায়। অবশ্য কেউ কেউ বাদাম, চানাচুর, আমড়া ও পানি বিক্রি করে টাকা আয় করে।
বিকেলে হাতিরঝিলে মানুষের আনাগোনা বাড়ে, এ সময় সুবিধাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যাও বাড়ে। সন্ধ্যার পর থেকে এসব শিশু কমতে শুরু করে। রাত বাড়তে থাকলে শিশুরা ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু রাজুর আর ঘরে ফেরা হয় না। কেননা, খোলা আকাশের নিচে হাতিরঝিলই তার ঘরবাড়ি। কয়েক দিন পরপর বউবাজারের মসজিদের ওয়াশ রুম থেকে গোসল করে আসে। প্রস্রাব-পায়খানা সারে হাতিরঝিলের ঝোপঝাড়ে। এভাবেই বউবাজারসংলগ্ন হাতিরঝিল এলাকায় দিন কেটে যাচ্ছে রাজুর। খোলা আকাশের নিচে রাতও কাটে তার। তবে গভীর রাতে যখন চোখ বুঝে আসে, তখন চটপটির টং দোকানের পেছনে গিয়ে গা এলিয়ে দেয়। রাতের নির্জনতা, অন্ধকার ও একাকিত্বকে সে জয় করেছে। ফলে কোনো কিছুতেই আর ভয় পায় না রাজু। আর তাই এমন স্বাধীন জীবনও ছাড়তে চায় না। রাজুর সঙ্গে আলাপচারিতার ১৪ দিন পর সর্বশেষ ৩ নভেম্বর রাত আটটায় ফের ওই কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে গিয়ে দেখা যায় রাজু ঘুমাচ্ছে। আদর–স্নেহবঞ্চিত ঘুমন্ত রাজুর চেহারা আরও একটু কাহিল মনে হচ্ছে। মাথার লম্বা চুল ছাঁটা হয়েছে। পরনে কালো ও হালকা নীল রঙের ট্রাউজার, কিন্তু গা উদোম। পাশে পড়ে আছে একটি গেঞ্জি। সমবয়সী কামরুল নামের এক কিশোর এসে রাজুর কানের কাছে বাঁশের বাঁশি বাজিয়ে তার ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু ঘুমের ঘোরে রাজু চরম বিরক্তি প্রকাশ করলে কামরুল হাল ছেড়ে দেয়। কিশোর কামরুল জানাল, রাজু ইদানীং গভীর রাতে কারওয়ান বাজারে গিয়ে মাছ টোকাইয়ের কাজ করে। সকালে সেসব মাছ বিক্রি করে খাবার খেয়ে ফের এসে ঘুমিয়ে পড়ে।


শুধু হাতিরঝিলে নয়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পথশিশু বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ছড়াছড়ি। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের সিনিয়র ম্যানেজার (কমিউনিকেশনস অ্যান্ড মিডিয়া) শারারাত ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা শহরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের তাঁরা সেবা দিয়ে আসছেন। ঢাকার গাবতলী, লালবাগ, মিরপুর, সায়েদাবাদ ও কমলাপুর এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ৪৫৩ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য দিনের বেলা খেলাধুলা, পড়ালেখা ও বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে আলাদাভাবে হাতিরঝিলে তাঁদের সেবাকেন্দ্র নেই। শিশুরা উল্লিখিত জায়গা থেকে সেবা নিতে পারে। তিনি বলেন, নভেম্বর মাস থেকে সুনির্দিষ্টভাবে রাজধানীর মুগদায় ৬০ জন পথশিশুর জন্য একটি আবাসিক কেন্দ্র খোলা হবে। সেখানে শিশুর জন্য বিনা মূল্যে রাতে থাকা, খাওয়া, বিনোদন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

শারারাত ইসলাম বলেন, ঢাকায় পথশিশুদের মোট সংখ্যা নিয়ে সেভ দ্য চিলড্রেনের আলাদা কোনো জরিপ নেই। তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ২০০৫ সালে এক গবেষণায় উল্লেখ করে, ঢাকা শহরে মোট ২ লাখ ৪৯ হাজার ২০০ পথশিশু রয়েছে। একই গবেষণায় আগামী ২০২৪ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হবে বলে ধারণা করা হয়।

Report by - //dailysurma.com

Facebook Comments

bottom